editor

প্রকাশিত: ১০:৪৩ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২, ২০২০

ফাতেমার কষ্টের জীবনে পাকা ঘরের আনন্দ

ফাতেমার কষ্টের জীবনে পাকা ঘরের আনন্দ

বড়লেখা প্রতিনিধি
ফাতেমা বেগম কখনো সবজিখেতে দিনমজুরি করে আবার কখনো বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসার চালান। স্বামী মারা যাওয়ার পর জীবিকার তাগিদে তার এই সংগ্রাম শুরু হয়। আছে বলতে এক চিলতে জমিতে খড়ের ছাউনির মাটির ছোট্ট ঘর। সেই ঘরটিতে সন্তানদের নিয়ে কোনোরকমে মাথা গুঁজে দিন কাটিয়েছেন। বর্ষায় খড়ের ছাউনি দিয়ে ঘরের ভেতরে পানি পড়ে ভিজেছে বিছানাপত্র। হাড়কাঁপানো শীতে করেছেন কষ্ট। এমন জরাজীর্ণ মাটির ঘরটি পরিবর্তন হবে, তা কল্পনায়ও ছিল না। কিন্তু অনেকটা চোখের পলক না ফেলতেই জরাজীর্ণ সেই ঘরের বদল হয়েছে।
জীবন সংগ্রামী নারী ফাতেমা না চাইলেও তার নিজের এক চিলতে জমিতে পাকা ঘর করে দিয়েছে সরকার। তিনি এখন পাকা ঘরে থাকেন। নতুন ঘরের আনন্দে ঢেকে গেছে তার জরাজীর্ণ ঘরের কষ্ট। সম্প্রতি তিনি নতুন ঘর চাবি পেয়েছেন।
ফাতেমার বাড়ি মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার তালিমপুর ইউনিয়নের হাকালুকি হাওর পারের মুর্শিবাদকুরা গ্রামে। সরেজমিনে কথা হয় তার সাথে। তিনি বলেন, ‘মানুষের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাই। ঘর নিয়া কত কষ্ট করেছি। আগে বৃষ্টি আসলে চিন্তায় থাকতাম। আমি মানুষের বাড়িত ও জমিত কাজে থাকতাম। আর ছেলে-মেয়েগুলোর কথা চিন্তা করতাম। বৃষ্টিতে ঘরে কিভাবে এরা থাকবে। কত রাতদিন না ঘুমাইয়া কাটছে। এর কোনো হিসাব নাই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারে ধন্যবাদ জানাই। তাইন যে, আমার মতো গরীবের দুঃখটা বুঝিয়া ঘর দিছইন।’
তার মতো ভিক্ষক, প্রতিবন্ধী, দিনমজুর, রিকশাচালক, স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদপ্রাপ্ত নারী, বিধবা, অন্যের বাড়িতে কাজ করেন, অতিদরিদ্র নারীসহ ২৬২টি অসচ্ছল ও দুস্থ পরিবার সরকারের সহায়তায় এ রকম পাকা ও আধপাকা ঘর পেয়েছে। বড়লেখা উপজেলা প্রশাসন সরকারের ৪টি প্রকল্পের অর্থায়নে এসব ঘর নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করেছে। এতে সরকারের মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা। সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহহীন দরিদ্র পরিবারগুলোর হাতে ঘরের চাবি তুলে দেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন এমপি।
বড়লেখা উপজেলা প্রশাসন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় ও সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে উপজেলার দরিদ্র, অসচ্ছল ও পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ২৬২টি ঘর তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের অধীনে ২২৩টি দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দেয়া হয়। এগুলো নির্মাণে সরকারের ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ২৩ লক্ষ টাকা। উপজেলার বর্ণি ইউনিয়নে ১৯টি, দাসেরবাজারে ২০টি, নিজবাহাদুর ইউনিয়নে ২৩টি, উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নে ২৬টি, দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নে ১৮টি, বড়লেখা সদর ইউনিয়নে ২৩টি, তালিমপুর ইউনিয়নে ২৭টি, দক্ষিণভাগ উত্তর ইউনিয়নে ২১টি, সুজানগর ইউনিয়নে ২৩টি, দক্ষিভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নে ২৩টি পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়। প্রতিটি ঘর নির্মাণ কাজে ব্যয় হয়েছে এক লাখ টাকা করে। একটি শৌচাগার, পাকা ভিটা ও বারান্দা, টিনের বেড়াসহ থাকার ঘর।
এছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে টিআর/কাবিটা কর্মসূচির বিশেষ বরাদ্দে গ্রামীণ দরিদ্র গৃহহীন জনগোষ্ঠীর জন্য দুর্যোগসহনীয় বাসগৃহ নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় বড়লেখা উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে মোট ২৪টি অসহায় ও দরিদ্র পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে উপজেলার বর্ণি ইউনিয়নে ২টি, দাসেরবাজার ৩টি, নিজবাহাদুর ইউনিয়নে ৩টি, উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নে ২টি, দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নে ২টি, বড়লেখা সদর ইউনিয়নে ২টি, তালিমপুর ইউনিয়নে ২টি, দক্ষিণভাগ উত্তর ইউনিয়নে ২টি, সুজানগর ইউনিয়নে ৩টি, দক্ষিভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নে ৩টি পরিবারকে ঘর দেওয়া হয়। ২৪টি ঘর নির্মাণে সরকারের ব্যয় হয়েছে ৭১ লাখ ৯৬ হাজার ৬৪০ টাকা।
অপরদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে গৃহিত “বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা” শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় চলতি ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে রবিদাস সম্প্রদায়ের ১০টি পরিবারকে আধাপাকা ঘর নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে। বড়লেখা উপজেলার দাসেরবাজার ইউনিয়ন এলাকায় ২টি, বড়লেখা পৌরসভা ও সদর ইউনিয়নে ৪টি, তালিমপুর ইউনিয়নে ১টি, দক্ষিণভাগ উত্তর ইউনিয়নে ১টি, সুজানগর ইউনিয়নে ১টি, দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নে ১টি পরিবার ঘর পেয়েছে। প্রতিটি ঘর নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা।
২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের অর্থায়নে ০৫টি অসচ্ছল চা শ্রমিক পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। বৈদ্যুতিক সুবিধাসহ প্রতিটি ঘরে রয়েছে দুটি কক্ষ। ঘরের সাথে আছে বারান্দা, অপর পাশে আছে রান্নাঘর, বাথরুম, শৌচাগার। চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে মডেল আবাসন নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত ঘরগুলো নির্মাণে সরকারের ব্যয় হয়েছে ২০ লাখ ৩ হাজার টাকা। বড়লেখা উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর কাজগুলো বাস্তবায়ন করেছে। কাজ শেষ হওয়ায় জুন মাসে উপকারভোগীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আগামী অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কাছে চাবি হস্তান্তর করার কথা রয়েছে।
বড়লেখা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. উবায়েদ উল্লাহ খান গত রোববার বলেন, ‘বড়লেখা উপজেলাটি দূর্গম ও পাহাড় টিলা বেষ্টিত হওয়ায় প্রকৃত উপকারভোগী বাছাই এবং ঘর নির্মাণ কাজ বাস্তবায়নে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ঘরগুলো হস্তান্তর করা হয়েছে। আরও কিছু ঘরের বরাদ্দ এসেছে। পর্যায়ক্রমে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।’
বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শামীম আল ইমরান বলেন, ‘ভালো মানের জিনিস দিয়ে ডিজাইন অনুযায়ী ঘরগুলো তৈরি করা হয়েছে। যাদের ঘর দেওয়া হয়েছে তারা খুবই দরিদ্র। একটি ভালো ঘর নির্মাণ করা তাদের কাছে ছিল স্বপ্নের মতো। পাকা ঘর পেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলো খুব খুশি। নতুন ঘর পেয়ে তারা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন। দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর যে, উদ্যোগ ‘একটা মানুষও গৃহহীন থাকবে না’ এটা বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে সদা তৎপর থেকে সক্রিয়ভাবে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। স্থানীয় সাংসদ ও পরিবেশ মন্ত্রীর নির্দেশনা ও পরামর্শ এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে আমাকে প্রেরণা ও সাহস জুগিয়েছে। সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবেশ মন্ত্রী গৃহহীন, দরিদ্র এই মানুষদের হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেন।’

Sharing is caring!


সর্বশেষ সংবাদ

প্রধানমন্ত্রী প্রতিনিয়ত বন্যা ও ত্রাণ কার্যক্রমের খোঁজ-খবর নিচ্ছেন: এড. রনজিত সরকার

প্রধানমন্ত্রী প্রতিনিয়ত বন্যা ও ত্রাণ কার্যক্রমের খোঁজ-খবর নিচ্ছেন: এড. রনজিত সরকার

সুনামগঞ্জ -১ আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট রনজিত চন্দ্র সরকার বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিনিয়ত বন্যা ও ত্রাণ কার্যক্রমের খোঁজ-খবর নিচ্ছেন

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তাহমিনার কৃতিত্ব

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তাহমিনার কৃতিত্ব

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তাহমিনা আহমদ বৃটেনে অসাধারণ সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। ১২ জুলাই প্রকাশিত ফলাফলে তিনি বিশ্ববিখ্যাত লন্ডন ইউনিভার্সিটি অব কুইন মেরী

সরকারী ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে জেলা ভিত্তিক কোটা বহাল রাখার দাবী সিলটি পাঞ্চায়িত এর

সরকারী ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে জেলা ভিত্তিক কোটা বহাল রাখার দাবী সিলটি পাঞ্চায়িত এর

সরকারী ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে জেলা ভিত্তিক কোটা বহাল রাখার দাবী জানিয়েছে সিলটি পাঞ্চায়িত এর নেতৃবৃন্দ। শনিবার (১৩ জুলাই) সিলেট বিভাগের

দক্ষিণবঙ্গের ডেবরায় সেপটিক ট‍্যাংক থেকে ৩ জনের মৃতদেহ উদ্ধার 

দক্ষিণবঙ্গের ডেবরায় সেপটিক ট‍্যাংক থেকে ৩ জনের মৃতদেহ উদ্ধার 

সুজন চক্রবর্তী, আসাম (ভারত) প্রতিনিধি :: শনিবার (১৩ জুলাই) সকালে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে ভারতের দক্ষিণবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরা ব্লকের

দক্ষিণবঙ্গে রাতের অন্ধকারে অ‍্যাম্বুল‍্যান্স দুর্ঘটনায় নিহত ৬

দক্ষিণবঙ্গে রাতের অন্ধকারে অ‍্যাম্বুল‍্যান্স দুর্ঘটনায় নিহত ৬

সুজন চক্রবর্তী, আসাম (ভারত) প্রতিনিধি :: ভারতের দক্ষিণবঙ্গের মেদিনীপুরে অ‍্যাম্বুল‍্যান্স দুর্ঘটনায় নিহত ৬ জন। মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটেছে শুক্রবার (১২ জুলাই)

সারা দেশে ইন্টারনেটে থাকতে পারে ধীরগতি

সারা দেশে ইন্টারনেটে থাকতে পারে ধীরগতি

কক্সবাজারে দেশের প্রথম সাবমেরিন ক্যাবল (সিমিইউ-৪) রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য শনিবার (১৩ জুলাই) সকাল থেকে সারা দেশে ১২ ঘণ্টা আংশিকভাবে ইন্টারনেট

পবিত্র আশুরার রোজা রাখার ফজিলত

পবিত্র আশুরার রোজা রাখার ফজিলত

হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী :: ইসলামের প্রাথমিক যুগে আশুরার রোজা ফরজ ছিলো। দ্বিতীয় হিজরি সনে রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার বিধান

মেরামত হলো দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল

মেরামত হলো দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল

দেশে ইন্টারনেট সরবরাহে সিঙ্গাপুর হতে পশ্চিমপ্রান্তে ইন্দোনেশিয়ার জলসীমায় আকস্মিকভাবে বিচ্ছিন্ন দেশের দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলটির প্রায় আড়াই মাস পর মেরামত সম্পন্ন