editor

প্রকাশিত: 11:15 AM, September 15, 2026

আইসি সজল কানুর বিরুদ্ধে মাসোয়ারা ও চোরাচালানে মদদের অভিযোগ

লালপুর নৌপুলিশ ফাঁড়ি

আইসি সজল কানুর বিরুদ্ধে মাসোয়ারা ও চোরাচালানে মদদের অভিযোগ

সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ থানাধীন লালপুর নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক সজল কুমার কানুকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সুরমা নদী ও আশপাশের নৌপথে অবৈধ বালু উত্তোলন, ভারতীয় পণ্য চোরাচালান, গরু পরিবহন এবং নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারী জালের কারবার নিয়ন্ত্রণে একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে। আর এই চক্রকে কথিত মাসোয়ারার বিনিময়ে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আইসি সজল কুমার কানুর বিরুদ্ধে।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব অভিযোগের পক্ষে বিভিন্ন নথি, ভিডিও, অডিও ও কথোপকথনের রেকর্ড রয়েছে।অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে কথিত একটি ‘মাসোয়ারা তালিকা’।

অভিযোগকারীদের দাবি, ওই তালিকায় লালপুর নৌপুলিশ ফাঁড়ির আওতাধীন বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের তথ্য রয়েছে। অবৈধ ড্রেজার, ভারতীয় পণ্য পাচার, গরুর নৌযান ও নিষিদ্ধ জালের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে একাধিক ব্যক্তি অর্থ সংগ্রহ করে থাকেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে জামালগঞ্জের তৌফিক, বর্ডার বাজারের হান্নান, চাঁনপুরের ফয়নূনূর, গজারিয়ার জয়নাল, কাসেম মোল্লা, তাজুল, রাসেল ও মনফরসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি সুরমা নদীতে সরকারি নির্ধারিত টোলের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রেও কয়েকজনকে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। গত ২৬ আগস্ট রাতে গজারিয়া বাজার ঘাট এলাকায় নৌপুলিশের অভিযানে জয়নাল মিয়ার ব্যবহৃত স্পিডবোট থেকে ভারতীয় শাড়ি উদ্ধারের ঘটনাও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে পুলিশের পক্ষ থেকে ৩৯৮ পিস ভারতীয় শাড়ি ও একটি স্পিডবোট উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ওই ঘটনায় আটক বা মামলার আসামি জয়নাল মিয়া পুলিশের কাছে চোরাচালান কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। জয়নাল মিয়ার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, আইসি সজল কুমার কানুর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে টাকা দিয়ে ‘লাইন ক্লিয়ার’ করে চোরাচালানের ব্যবসা চালিয়ে আসছেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, মাসিক দেড় লাখ টাকার কথিত সমঝোতার মাধ্যমে তিনি চোরাচালান চালিয়ে আসছিলেন। একই ঘটনায় ২৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ২০ হাজার টাকা দেওয়ার মাধ্যমে পাঁচটি স্পিডবোটে ভারতীয় পণ্য পরিবহনের ‘লাইন’ নেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে।

অভিযোগের সূত্রে আরও জানা যায়, চাঁনপুরের ফয়নূনূর এবং নরসিংদীর মোস্তফাকেও চোরাচালান চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। তাদের ভূমিকা এবং আইসি সজল কুমার কানুর সঙ্গে কথিত যোগাযোগের বিষয়টিও তদন্তের দাবি রাখে।এদিকে ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে একটি ঘটনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই দিন ০১৭১১—৯৭৬৮ নম্বর থেকে লালপুর নৌপুলিশ ফাঁড়ির সরকারি মোবাইল নম্বরে ফোন করে একজন ব্যক্তি নৌকার নাম উল্লেখ করে জানানÑদুটি বালুবাহী নৌকা যাচ্ছে এবং বালুর নিচে ভারতীয় পণ্য ও মজুত বালু রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, এমন তথ্য পাওয়ার পরও নৌযান দুটি আটক করা হয়নি। এ ঘটনায় অভিযোগকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন, নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার পরও কেন নৌযান দুটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর আগে ২৩ থেকে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত চোরাচালানের পণ্য পরিবহনের চেষ্টা চলার পর গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ২৬ আগস্ট অভিযান পরিচালনা করে নৌপুলিশ। ওই অভিযানে ভারতীয় পণ্য উদ্ধারের পর ফাঁড়ির অভ্যন্তরে মতবিরোধ তৈরি হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, অভিযানের বিষয়ে আইসিকে অবহিত করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরবর্তীতে জুনিয়র কর্মকর্তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান। এমনকি উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।এর আগে ২৫ জুলাইয়ের একটি কথোপকথনের অডিও রেকর্ডকে কেন্দ্র করেও আইসি সজল কুমার কানুকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ওই কথোপকথনে একজন পুলিশ সদস্য অবৈধ ড্রেজার আটক করে মামলা করার অনুমতি চাইলে ড্রেজার ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্য একটি কথোপকথনেও আটক মালামাল ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।অন্যদিকে এএসআই আল ইমরান বিন রাজ্জাকের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

অভিযোগের সূত্র অনুযায়ী, তিনি সুরমা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা মূল্যের সরঞ্জামসহ একটি ড্রেজার জব্দ করে মামলা করেন। ওই মামলার এফআইআর নম্বর ১৬ বলে জানানো হয়েছে। পরবর্তীতে তাঁর বদলির আদেশ হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছেÑঅবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনাকারী একজন পুলিশ সদস্যকে কেন বদলি করা হলো। বিষয়টি বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারী জালের ব্যবহার ও বাণিজ্য নিয়েও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। মৎস্যসম্পদ রক্ষায় নিষিদ্ধ এ জালের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার কথা থাকলেও লালপুর নৌপুলিশ ফাঁড়ির আওতাধীন এলাকায় দীর্ঘ সময়েও এ সংক্রান্ত মামলা না হওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ সদস্যরা এসব জাল আটক করলেও পরবর্তীতে ঊর্ধ্বতন নির্দেশে সেগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি স্থানীয় কয়েকজন সচেতন ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন, গত বছর জয়নালের একটি স্পিডবোট ও ভারতীয় পণ্য আটকের পর ঘটনাস্থলে গিয়ে আইসি সজল কুমার কানু সেগুলো ছেড়ে দেন। পরবর্তীতে ওই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জামালগঞ্জ থানায় ‘ডাকাতির প্রস্তুতি’র মামলা করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। সব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কথিত ‘মাসোয়ারা’, চোরাচালানকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ, জব্দ মালামাল ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ, অবৈধ ড্রেজার ও বালু উত্তোলনের বিষয়ে কথিত ছাড় এবং এএসআই আল ইমরানের বদলি। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, বিষয়গুলোকে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বিরোধ হিসেবে পাশ কাটিয়ে না গিয়ে নৌপুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্ত করা হোক।

বিশেষ করে কথিত মাসোয়ারা তালিকা, জয়নাল মিয়ার বক্তব্য, অডিও রেকর্ড, ২৬ আগস্টের উদ্ধার অভিযানের নথি, ভারতীয় পণ্য উদ্ধারের মামলা, ১২ সেপ্টেম্বরের দুটি বালুর নৌকা সংক্রান্ত তথ্য, এফআইআর নম্বর ১৬, এএসআই আল ইমরানের বদলির আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বক্তব্য পর্যালোচনা করা হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। এ বিষয়ে লালপুর নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক সজল কুমার কানুর বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে প্রকাশিত আগের এক প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে পরে কথা বলার কথা জানিয়েছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে।অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

তাদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাসোয়ারা গ্রহণ, চোরাচালানে মদদ কিংবা জব্দকৃত মালামাল ছেড়ে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠলে বিষয়টি দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা জরুরি। এতে প্রকৃত ঘটনা যেমন বেরিয়ে আসবে, তেমনি নৌপথে চোরাচালান প্রতিরোধ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও অটুট থাকবে।

Sharing is caring!


সর্বশেষ সংবাদ

উছমানপুর ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী যুবদল নেতা রেদওয়ান আহমদ

উছমানপুর ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী যুবদল নেতা রেদওয়ান আহমদ

আসন্ন উছমানপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন সিলেট জেলা যুবদলের সাবেক দপ্তর সম্পাদক মো. রেদওয়ান

সিলেট বিভাগ গণদাবি পরিষদ ফ্রান্স শাখার কমিটি গঠন

সিলেট বিভাগ গণদাবি পরিষদ ফ্রান্স শাখার কমিটি গঠন

ফ্রান্সে বসবাসরত সিলেট বিভাগের প্রবাসীদের ঐক্যবদ্ধ করা এবং তাদের অধিকার ও ন্যায্য দাবি-দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে ‘সিলেট বিভাগ গণদাবি পরিষদ ফ্রান্স

আমরা জুলাই যোদ্ধা দক্ষিণ সুরমা উপজেলা সমন্বয় কমিটি গঠন

আমরা জুলাই যোদ্ধা দক্ষিণ সুরমা উপজেলা সমন্বয় কমিটি গঠন

আহত জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসা ও এমআইএস (MIS)-এর কাজ ত্বরান্বিত করার লক্ষে ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ সিলেট জেলা কমিটির পক্ষ থেকে দক্ষিণ

সিলেট জেলা বিএনপির সদস্য সচিব পদে আলোচনায় চৌধুরী শাহীন

সিলেট জেলা বিএনপির সদস্য সচিব পদে আলোচনায় চৌধুরী শাহীন

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ত্যাগ, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা ও রাজপথের অভিজ্ঞতার মূল্যায়নে সিলেট জেলা বিএনপির সদস্য সচিব হিসেবে সাবেক ছাত্রনেতা কামরুল হাসান

দুই দশকের অনৈতিক সাম্রাজ্য, কিশোর গ্যাং ও মদদদাতাদের অন্ধকার জাল

দুই দশকের অনৈতিক সাম্রাজ্য, কিশোর গ্যাং ও মদদদাতাদের অন্ধকার জাল

সিলেটের জালালাবাদ থানাধীন ভাগারপাড় গ্রামটি বাহ্যিক শান্ত মনে হলেও গত দুই দশক ধরে এক অন্ধকার অপরাধ সাম্রাজ্যের জালে বন্দি। অনৈতিক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উন্নয়ন চিত্র জনসাধারণের কাছে তুলে ধরতে হবে: সাহেদ আহমদ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উন্নয়ন চিত্র জনসাধারণের কাছে তুলে ধরতে হবে: সাহেদ আহমদ

সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায় জিয়া মঞ্চের উদ্যোগে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায় জিয়া মঞ্চের উদ্যোগে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

আবদুল জব্বার কল্যাণ ট্রাস্টের ‘মাসিক ভাতা কার্ড’ বিতরণ

আবদুল জব্বার কল্যাণ ট্রাস্টের ‘মাসিক ভাতা কার্ড’ বিতরণ

অসহায় ও দরিদ্রদের সহায়তায় মাসিক ভাতা চালু করেছে ‘আবদুল জব্বার জলিল কল্যাণ ট্রাস্ট’। শনিবার দুপুরে নগরের জেলরোডস্থ আনন্দ টাওয়ারে আনুষ্ঠানিকভাবে

অক্টোবর সেবা সপ্তাহ উপলক্ষে শিক্ষার্থীদের মাঝে লায়ন্স ক্লাব অব সিলেট হলি সিটির শিক্ষা ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ

অক্টোবর সেবা সপ্তাহ উপলক্ষে শিক্ষার্থীদের মাঝে লায়ন্স ক্লাব অব সিলেট হলি সিটির শিক্ষা ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ

অক্টোবর সেবা সপ্তাহ উপলক্ষে লায়ন্স ক্লাব অব সিলেট হলি সিটির উদ্যোগে নগরীর কুশিঘাট এলাকার ‘ইমুর ইশকুল’-এর শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষাসামগ্রী ও