editor

প্রকাশিত: 11:25 AM, September 16, 2026

গরম-লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত সিলেটের পোল্ট্রি শিল্প

তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে মুরগির মৃত্যু, ব্যাহত উৎপাদন, লোকসানের মুখে খামারিরা

গরম-লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত সিলেটের পোল্ট্রি শিল্প

তীব্র গরম ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সিলেটের পোল্ট্রি শিল্প। প্রচণ্ড তাপমাত্রায় মুরগির স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও খাদ্য গ্রহণ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট ও হিট স্ট্রেসে বাড়ছে মৃত্যুহার। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভ্রাট যুক্ত হওয়ায় খামারে ফ্যান, ভেন্টিলেশন ও পানির সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে খামারিদের লোকসান।

সিলেটের বিভিন্ন উপজেলা ও শহরতলির পোল্ট্রি খামার ঘুরে খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গরমের সময় মুরগি স্বাভাবিকের তুলনায় কম খাবার গ্রহণ করে। অতিরিক্ত তাপমাত্রায় দ্রুত হাঁপিয়ে ওঠে এবং খামারের ভেতরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না করলে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে বিদ্যুৎ চলে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।

খামারিদের ভাষ্য, আধুনিক পোল্ট্রি খামারে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে এক্সহস্ট ফ্যান, ভেন্টিলেশন সিস্টেম, পানির পাম্প ও কুলিং ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে এসব ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালাতে গিয়ে বাড়তি ডিজেল বা জ্বালানি খরচ করতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে।

পোল্ট্রি খামারিদের জন্য বিদ্যুৎ এখন শুধু একটি পরিষেবা নয়, উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মুরগির শেডে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল, পানির ব্যবস্থা, আলো ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। কিন্তু ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে অনেক খামারেই স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

খামারিরা বলছেন, লোডশেডিং মোকাবিলায় জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ বিলের পাশাপাশি জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও যুক্ত হচ্ছে। ছোট ও মাঝারি খামারিরা এ বাড়তি ব্যয় বহন করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন।

পোল্ট্রি বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত তাপমাত্রায় মুরগির শরীরে তাপজনিত চাপ তৈরি হয়। এতে খাবার গ্রহণ কমে যায় এবং ওজন বৃদ্ধির হারও কমতে পারে। ডিম উৎপাদনকারী মুরগির ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত গরমের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

খামারিরা জানান, গরমের সময় মুরগির যত্নে বাড়তি পানি, ভিটামিন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা করতে হয়। শেডের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত শ্রম ও সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হয়। ফলে একই পরিমাণ মুরগি উৎপাদন করতেও আগের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে।

উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও খামারিরা সবসময় সেই অনুপাতে বাজারে দাম পাচ্ছেন না। স্থানীয় বাজারে মুরগির দাম কমে গেলে উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের পার্থক্য তৈরি হয়। আবার দাম বেড়ে গেলে ভোক্তা পর্যায়ে চাপ সৃষ্টি হয়।

খামারিদের অভিযোগ, পোল্ট্রি শিল্পে উৎপাদন খরচ, বাচ্চা, খাদ্য, ওষুধ, বিদ্যুৎ, শ্রম ও পরিবহন ব্যয়Ñসবকিছু মিলিয়ে খরচ বাড়ছে। কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা না থাকায় তারা উৎপাদনের প্রকৃত খরচ অনুযায়ী ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে পারছেন না।

সিলেটের পোল্ট্রি শিল্পে বড় খামারের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা রয়েছেন। অনেকেই সীমিত মূলধন নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। দীর্ঘস্থায়ী গরম, বিদ্যুৎ সংকট কিংবা বাজারদরের অস্থিরতা তাদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করছে।

খামারিরা বলছেন, একবার বড় ধরনের ক্ষতি হলে নতুন করে মুরগি তোলার মতো মূলধন জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেক উদ্যোক্তা ধীরে ধীরে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার কথাও ভাবছেন।

পোল্ট্রি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে গরমের মৌসুমে খামার এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময়সূচি আগাম জানানো, খামারিদের জন্য প্রযুক্তিগত পরামর্শ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

একই সঙ্গে মুরগির খাদ্য, বাচ্চা ও ওষুধের বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি এবং উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।

সিলেটের পোল্ট্রি শিল্প শুধু মাংস ও ডিমের চাহিদা পূরণ করছে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে খামারি, শ্রমিক, খাদ্য সরবরাহকারী, পরিবহন ব্যবসায়ীসহ একটি বড় অর্থনৈতিক চক্র। এ শিল্পে সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব কর্মসংস্থান ও স্থানীয় বাজারেও পড়তে পারে।

তাই গরম ও লোডশেডিংজনিত সাময়িক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি পোল্ট্রি শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে বিদ্যুৎ সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয়, বাজারদর ও খামার ব্যবস্থাপনা এই চারটি বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে সিলেটের সম্ভাবনাময় পোল্ট্রি খাত আরও সংকটে পড়তে পারে।

Sharing is caring!


সর্বশেষ সংবাদ

‎বিশ্বনাথে এসআরবি’র হাত থেকে হত্যা মামলার আসামি ছিনতাই

‎বিশ্বনাথে এসআরবি’র হাত থেকে হত্যা মামলার আসামি ছিনতাই

বিশ্বনাথে গত ২০ অক্টোবর একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার ৩ নম্বর এজাহারনামীয় আসামি মান্নান মিয়াকে আটক করতে গিয়ে স্থানীয় এক ইউপি

মশক নিধনে সিসিকের চরম ব্যর্থতা, ডেঙ্গু আতঙ্কে অতিষ্ঠ নগরবাসী

মশক নিধনে সিসিকের চরম ব্যর্থতা, ডেঙ্গু আতঙ্কে অতিষ্ঠ নগরবাসী

ফ্যান চালিয়ে, জানালার নেট আটকে কিংবা কয়েল ও স্প্রে জ্বালিয়েও রক্ষা মিলছে না। মশার উপদ্রবে সিলেট নগরজুড়ে তৈরি হয়েছে এক

বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সুরক্ষায় জাতিসংঘের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ: আলহাজ্ব আতাউর রহমান

বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সুরক্ষায় জাতিসংঘের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ: আলহাজ্ব আতাউর রহমান

বিএমবিএএফ সিলেট বিভাগের সভাপতি ও জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আতাউর রহমান বলেছেন, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সুরক্ষায়

ডেভিলদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল সিলেট স্টেশন ক্লাব

ডেভিলদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল সিলেট স্টেশন ক্লাব

সিলেটের অভিজাতদের ক্লাব খ্যাত সিলেট স্টেশন ক্লাব ১৪০ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে বন্দরবাজারে। পাশেই জেলা পরিষদ। একটু ঘুরলেই জেলা প্রশাসকের

নাজিরবাজারে ‘গ্যাস এমদাদ’র গোপন গোডাউনে বিপজ্জনক ক্রসফিলিং

নাজিরবাজারে ‘গ্যাস এমদাদ’র গোপন গোডাউনে বিপজ্জনক ক্রসফিলিং

সিলেটে সরকারি ও বেসরকারি এলপিজি গ্যাস নিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি অসাধু সিন্ডিকেট। তাদের কারসাজিতে চরম ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতির

মোমেন-পত্নী সেলিনা-জুয়েল ও হেলেনের সাম্রাজ্য সামলাচ্ছেন বিতর্কিত মিসবাহ

মোমেন-পত্নী সেলিনা-জুয়েল ও হেলেনের সাম্রাজ্য সামলাচ্ছেন বিতর্কিত মিসবাহ

২৫% কমিশন, জালিয়াতি ও দখলদারিত্বের অভিযোগ আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাকালিন সময় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ. কে. আব্দুল মোমেনের ক্ষমতার দাপট

জেলা বিএনপির কাউকে মনোনয়ন দিলে মেয়র পদ হারানোর ঝুঁকিতে সিসিক

জেলা বিএনপির কাউকে মনোনয়ন দিলে মেয়র পদ হারানোর ঝুঁকিতে সিসিক

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) নির্বাচনকে সামনে রেখে আধ্যাত্মিক ও প্রবাসী অধ্যুষিত এই নগরে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে, দ্রুত বদলাতে শুরু

আসছে সিলেট জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের নতুন কমিটি

আসছে সিলেট জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের নতুন কমিটি

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ স্বেচ্ছাসেবক লীগ। দলের রাজনীতিতে সক্রিয়তা ধরে রাখতে ও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মাঝে চাঙ্গা