টাকার ব্যাগে বন্দি প্রশাসন, দিনে ২ লাখে লাঠিয়াল, ৩ লাখে সাংবাদিক, ২ লাখে নেতা কেনার ফান্ড
‘গোয়াইনঘাটে লিজের নামে দৈনিক কোটি টাকার বালু লুট’
দায় এড়াচ্ছে প্রশাসন, ক্ষোভ ওসির বিরুদ্ধে, তিন রুটে চলে সাম্রাজ্য, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, দিনে লাখ লাখ টাকার ‘ম্যানেজ ফান্ড’, বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও নিষিদ্ধ ‘বোমা মেশিন’, লিজ ৮৪ একরের, লুটপাট ১১০ কিলোমিটারে
স্টাফ রিপোর্টার:
সিলেটের সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলায় কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে প্রকাশ্য দিবালোকে চলছে বালু লুটের এক অভূতপূর্ব মহোৎসব। পরিবেশ আইন ও ইজারার শর্ত ভেঙে স্থানীয় এক প্রভাবশালী চক্র, সর্বদলীয় রাজনৈতিক সিন্ডিকেট ও ধফসরহরংঃৎধঃরড়হং বা প্রশাসনের একাংশ মিলে পিয়াইন নদী, গোয়াইন নদী, ডাউকি অববাহিকাসহ হাজিপুর-আহারকান্দি বালু মহালকে চরম ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানকে সম্পূর্ণ ‘ম্যানেজ’ করে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদ ধ্বংস করছে এই চক্রটি। স্থানীয়দের ভাষ্য, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দেখাতে মাঝে-মাঝে লোকদেখানো অভিযান চালানো হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না, বরং নির্বিঘ্নে বালু লুটের সুযোগ করে দিয়ে প্রতিদিন থানার ওসির কাছে চলে যাচ্ছে ভাগের টাকা। চলতি বছর সিলেটের জেলা প্রশাসন (রাজস্ব শাখা) থেকে গোয়াইনঘাট উপজেলায় মাত্র একটি বালু মহাল ইজারা দেওয়া হয়। হাজিপুর-আহারকান্দি বালুমহালের মাত্র ৮৪.৫৭ একরের এই মহালটি ইজারা নেন ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার আব্দুল্লাহ আল মামুন, যিনি কোম্পানীগঞ্জের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার ভায়রা। গত ১৬ এপ্রিল দখল বুঝে নেওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করতে আব্দুল্লাহ আল মামুন স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ের শীর্ষ অন্তত ৪০ জন বিএনপি, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও যুবদল নেতাকে এই ব্যবসায় অংশীদার করেন। নির্দিষ্ট দাগ ও মৌজার ভেতরে বালু তোলার নিয়ম থাকলেও, এই বিশাল রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের আশ্রয়ে প্রায় ১১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন ও জোরপূর্বক অতিরিক্ত রয়্যালটি আদায়। গোয়াইনঘাট থানা লেবার ফেডারেশনের সভাপতি মদরিছ আলীর তথ্যমতে, এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে বালু মহালের সীমানায় লাল পতাকা টাঙিয়ে নির্দিষ্ট দাগ-খতিয়ান স্পষ্ট করার দাবি জানানো হলেও প্রশাসন তা করেনি। দাগ-খতিয়ান বা ঝুমলা উল্লেখ না থাকায় পুরো উপজেলাকেই ইজারার অন্তর্ভুক্ত মনে করে এই লুটপাট চালানো হচ্ছে।
সদর ইউনিয়নের ভেতরে পরগনা বাজার, তিতরাই ও লাঠি পশ্চিমপাড়ে অবৈধ ক্যাম্প বসিয়ে রসিদের মাধ্যমে বেপরোয়া রয়্যালটি আদায় করা হচ্ছে। সরকারিভাবে বালুর নির্ধারিত রয়্যালটি প্রতি ফুট ১ টাকা ৭৫ পয়সা হলেও, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জোরপূর্বক আদায় করা হচ্ছে ৮ থেকে ১০ টাকা। ফলে একটি ২০০ ফুটের ট্রাক এবং সাধারণ নৌকাগুলো থেকে ১ হাজার টাকা করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এমনকি ইজারা বহির্ভূত জায়গা থেকে বালু তুললেও সমপরিমাণ টাকা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে সাধারণ চালক ও শ্রমিকদের। সরকারি নির্দেশনায় নদী থেকে শুধু হাত বা ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে বালু তোলার নিয়ম থাকলেও, গোয়াইনঘাটে রাত গভীর হতেই নদী ও ফসলি জমি খুঁড়ে বালু তুলতে ব্যবহার করা হচ্ছে দানবীয় এক্সকাভেটর, ফেলুডার এবং পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর নিষিদ্ধ বোমা মেশিন। ফলে দক্ষিণ প্রতাপপুর ও কন্যাঙ্গল নদীর প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদীর বুক ঝাঁঝরা করে ফেলার কারণে স্থানীয় ঘরবাড়ি, স্কুল, মসজিদ, কবরস্থান ও সরকারি রাস্তাঘাট এখন নদীগর্ভে বিলীনের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এই অবৈধ বালু উত্তোলন ও বোমা মেশিন চালানো নির্বিঘ্ন রাখতে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা বিভিন্ন মহলে বণ্টন করা হয়। মাঠপর্যায়ে পেশীশক্তি প্রদর্শনের জন্য কামরুল, খায়রুল ও দেলোয়ার গংদের নিয়ন্ত্রিত লাটিয়ান বাহিনীকে প্রতিদিন দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব ও সিন্ডিকেট বজায় রাখতে আওয়ামী লীগ নেতা হেলাল ও বাবুল গংদের পেছনে দৈনিক খরচ করা হয় আরও দুই লাখ টাকা। এছাড়া সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ বন্ধ রাখতে এবং গণমাধ্যমকে নীরব রাখতে আমির উদ্দীন গংদের মাধ্যমে ‘সাংবাদিক ম্যানেজার ফান্ড’ নামে প্রতিদিন তিন লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই আমির উদ্দিন একাধারে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের কর্মচারী, আবার নিজেকে সাংবাদিকও দাবি করেন। তিনি সিটিতে কোনো ডিউটি না করে বর্তমানে বালু উত্তোলনের জন্য হাজিপুর ও গোয়াইনঘাটে অবস্থান করছেন।
পুরো উপজেলার এই বালু লুট ও চাঁদাবাজির সাম্রাজ্যকে মূলত তিনটি রুটে ভাগ করে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। রুট-১ তথা পরগনা বাজার নদী এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের নেতৃত্বে রয়েছে লোমান, হুনা মিয়া মেম্বার, জুনাব আলী ও আতিক সিন্ডিকেট। রুট-২ তথা লাটি নদী এলাকার মূল নিয়ন্ত্রক ও অর্থ কালেকশনকারী হিসেবে কাজ করছে বাবুল ও হুমায়ুন গং। এবং রুট-৩ তথা পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের হাজিপুর নদী এলাকায় পরিবেশ ধ্বংসের রাজত্ব কায়েম করেছে সিটির বিতর্কিত কর্মচারী আমির উদদীন, এনাম, আওয়ামী লীগ নেতা হেলাল, আজিজ মেম্বার ও দেলোয়ার বাহিনী। ইজারা বহির্ভূত জায়গা থেকে জোর করে অতিরিক্ত টাকা আদায় এবং অবৈধ ড্রেজার চালানোর প্রতিবাদ করায় গত মঙ্গলবার হাজিপুর এলাকায় সাধারণ গ্রামবাসী ও সিন্ডিকেটের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে, যার ফলে পুরো এলাকায় বর্তমানে চরম উত্তেজনা ও আইন-শৃঙ্খলার অবনতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এত বড় বিপর্যয়ের পরও গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) লিখিত আদেশের অজুহাত দেখিয়ে নিজের দায় এড়িয়ে দোষ চাপাচ্ছেন এডিসি রেভিনিউ ও ডিসি অফিসের ইজারাদারদের ঘাড়ে। তার দাবি, তাকে শুধু জায়গা বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং এর বাইরে তার কিছু করার নেই। অপরদিকে গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানকে সম্পূর্ণ ‘ম্যানেজ’ করেই এই চক্রটি চলছে বলে স্থানীয়দের তীব্র অভিযোগ। সদর বিট অফিসার ও পশ্চিম জাফলং বিট অফিসারের মাধ্যমে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা ওসির পকেটে যায় এবং ওসির পেছনে কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে বলেও এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে। ফলে ঊর্ধ্বতন ধঁঃযড়ৎরঃু-কে দেখাতে মাঝে মাঝে লোকদেখানো অভিযানের নাটক করা হলেও, পুলিশ সদস্যরা মূলত টাকার ব্যাগ নিয়ে নির্বিঘ্নে ফিরে আসেন।
পরিবেশ আইনবিদ ও সিলেটের সচেতন নাগরিক সমাজের মতে, প্রশাসন ও পুলিশের এই লোকদেখানো নাটক অনতিবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। এই বিধ্বংসী বোমা মেশিন সিন্ডিকেটের মূলহোতাদের এবং তাদের সহায়তাকারী প্রশাসনিক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের অনতিবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে গোয়াইনঘাটের নদী, ফসলি জমি ও সামগ্রিক পরিবেশকে রক্ষা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
Sharing is caring!