editor

প্রকাশিত: ১১:৪২ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৪, ২০২১

নবান্নের দেশে হেমন্ত…

নবান্নের দেশে হেমন্ত…

নবান্নের দেশে হেমন্ত...

4

আল-আমিন

শোবার ঘর থেকে বের হয়ে পুকুর পাড় হয়ে পশ্চিম দিকে একটু এগুতেই চোখে পড়ে সোনার ফসলের বিশাল সাম্রাজ্য। হাওরের নাম কৈয়াজুরি হাওর। হাওরের চারপাশ ঘিরে গৃরস্থ আর কৃষকের বাড়ি। প‚র্বপাশে চিলাই নদী। এই নদীতে শীতল ও স্বচ্চ জল বহমান। এই জলে গোসল করলে দেহ জুড়িয়ে যায়। একসময় এই নদীতে গোসল করতো নারী পুরুষ কিশোর কিশোরী সব বয়সী মানুষ। সারিসারি বিদ্যুতের খুঁটি আর ঝুলন্ত হাই ভোল্টেজ তারের নিচে আমন ফসলের মাঠে পাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধ বিরাজ করে। এমন নয়ন জুড়ানো সোনালী আভায় ভরে উঠে এই ফসলের মাঠ। তিনমাসে এই সোনার ফসলের শুরু থেকে শেষ আয়োজন হয়। ভাদ্রতে জমি প্রস্তুত। আশ্বিনে শরতের হাওয়ায় ঢেউখেলানো সবুজ মাঠ। কার্তিকে সোনার ধানের ফসলের ঢেউ। আর অগ্রহায়ণে ফসল ঘরে উঠে।

আমি খুব কাছ থেকে হেমন্ত দেখেছি। আমি দেখেছি আমাদের বাড়ির দক্ষিণ পাশে সারিসারি খেজুর গাছ থেকে নানু মিয়ার নিখুঁত হাতে খেজুর রস সংগ্রহ করার দৃশ্য। এই হেমন্তের ভোরে বাড়ির প‚র্বদিক থেকে গাছের সবুজ পাতা আর বাঁশবাগান ভেদ করে আসা স‚র্যের আলোর রশ্মি উঠানে পড়ার দৃশ্য এখনো ভুলবার নয়। এসময় মাঠ থেকে ঘরে তোলে নেওয়া হয় নতুন ফসল। সমস্ত মাঠের সোনার ধানের আভা বিকেলের পশ্চিম আকাশকে রাঙিয়ে দেয় সোনালী রঙে। মানুষের মনে জায়গা করে নেয় আনন্দ। এই নির্মল আনন্দে সৃষ্টির উল্লাসে মিশে যায় কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী সব বয়সী মানুষের মন। পুরো হেমন্তজুড়েই দেখি সুন্দর ও সবুজ কাঁচা ধানগাছে সতেজ থাকা আমন ধানের ক্ষেত। মাটির উপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা সারা মাঠ সবুজ গাছ আর সোনালী রঙে রাঙানো পুরো ফসলি মাঠ। এই মাঠে ধানের ওপর বাতাস ঢেউ খেলে যায় মাঠের এ প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্তে। এই ঢেউ খেলা অজানা নিরুদ্দেশ যাওয়ার সুন্দর ও ভালোলাগার। এই দৃশ্য হৃদয়ে ঝড়তুলে, মুগ্ধতা ছড়ায় অসীম ভালোবাসায়। এই হেমন্তের বিকেলের স‚র্য কিরণের মিষ্টতা অপরূপ সৌন্দর্যের দৃশ্য বাড়িয়ে দেয় পুরো দেশজুড়ে। পাকাধানগুলো পুরো মাঠজুড়ে সোনালী স‚র্যের মতো চিকচিক করে কৃষকের ভালোবাসায় আহ্লাদী হওয়ার অপেক্ষায় প্রহন গুনে। হেমন্তের স্নিগ্ধ করা ভালোলাগার দৃশ্য ভোরের ধানগাছের ডগায় শিশির জমে থাকার সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় হেমন্তের মায়াবী রূপের ঝলকে সৌন্দর্যেরই প‚র্বাভাস নিয়ে। দিন শুরুর প্রথম রোদের আলোয়ে গাছের পাতাগুলো হেসে ওঠে প্রকৃতির মায়ায়। চোখ যত দ‚র যায়, চোখে পড়ে আলোকোজ্জ্বল এক অপ‚র্ব একটি সকালের অভাবনীয় সৌন্দর্যের। শিশিরস্নাত সকাল, কাঁচাসোনার মতো রোদমাখা স্নিগ্ধসৌম্য দুপুর, পাখির কলকাকলি ভরা সন্ধ্যা আর মেঘমুক্ত আকাশে জ্যোৎস্না ডুবানো আলোকিত রাত হেমন্তকে আরও রহস্যময় করে তোলে সবার চোখে এবং প্রকৃতিতে এনে দেয় ভিন্নমাত্রা।
হেমন্তের এই মৌনতাকে ছাপিয়ে বাংলাদেশের মানুষের জীবনে নবান্ন প্রবেশ করে জাগরণের গান হয়ে। মানুষের জীবনে এনে দেয় উৎসবের ছোঁয়া।

8

ধানের মৌ মৌ গন্ধ, মাঠে মাঠে ধান কাটার ব্যস্ততা। বাড়ির উঠানে ধান আর বাড়ির আঙিনায় থাকা মাচাঁয় লাউ কুমড়াগাছের সবুজ পাতাগুলো লকলক করে বেড়ে ওঠার সৌন্দর্য হেমন্তের মিষ্টি রোদে আরো মায়াময় করে তুলে। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই সকালে নীড় থেকে বের হওয়া পাখিরা নিজ নীড়ে ফিরতে শুরু করে দল বেঁধে। তাদের কিচিরমিচির ধ্বনির সঙ্গে যোগ হয় বাঁশবাগান থেকে আসা এক ধরনের শিরশির শব্দ। তৈরি হয় অন্যরকম এক সুরের আবেশ। রাতের আকাশে দেখা মেলে অসংখ্য তারার মেলা। আকাশের কোথাও বিন্দু জমাট বাঁধা মেঘের উঁকি দেখা যায় না। মিটিমিটি তারা জ্বলে সারা রাত। সেই সঙ্গে চাঁদের শরীর থেকেও জ্যোৎস্না ঝরে পৃথিবীজুড়ে। এই রাতে ঝিরিঝিরি বাতাস আর মৃদু আলোর ঝলকানিতে তৈরি হয় মায়াময় এক ভালোবাসার রজনী। প্রকৃতির পরতে পরতে বিচিত্র রঙ মিশে যায় ভালোবাসার মানুষের মনের গহিনে। প্রকৃতি এই বহু বিচিত্র রূপ-রস-গন্ধ আমাদেরকে মুগ্ধ করে, বিস্মিত করে। এই রূপবিলাসিতায় বাংলার এই ঋতু প্রকৃতির সাথে আমাদেরকে ভাবনায় নিমজ্জিত করে। এঋতুতেই প্রকৃতি ও মানুষের রূপবদল বড় অপ‚র্ব করে তুলে। মাঠজুড়ে সবুজ পাতার মাঝে হলুদ আর সোনালী রঙের ধান। দলে দলে মানুষজন এসব ধান কাটে আঁটি বাঁধে আর এসব ধানের আঁটি কেউ মাথায় আবার কেউ কাঁধে ঝুলিয়ে বাড়ি ফেরে। হেমন্তের ভোরে কুয়াশা পড়া মাঠে বিন্দু বিন্দু শিশির জমে থাকা ধানগাছের পাতার ওপর ওড়াউড়ি করে সবুজ রঙের ফড়িং। এই সোনালি ধানের ক্ষেত ডিঙিয়ে প‚র্ব দিগন্ত রাঙিয়ে উঠে ভোরের স‚র্য। ভোরের ভিতর হালকা শীতের মাঝে মিষ্টি রোদ অন্যরকম ভালোলাগার অনুভ‚তি দেয়।

7

হেমন্তেই অনেক শীতের সবজি উঠতে শুরু করে। লালশাক, মুলাশাক, বাঁধাকপি, ফুলকপিসহ নানা ধরনের শাকসবজি এই হেমন্তেকে ঘিরেই মাঠে ফলে। একদিকে কৃষক ধান কেটে গোলায় তোলে, আবার অন্যদিকে রবি ফসল ফলানোর ব্যস্ততায় বয়ে যায় কৃষক-কৃষাণীর জীবনে অনাবিল পার্বণের আনন্দে। সবুজ ধানক্ষেতগুলো ধীরে ধীরে সোনারঙে বদলে যাওয়া আর অতিথি পাখিদের আগমন গ্রামে গ্রামে খেজুর রস আর নতুন ধানের পিঠার ঘ্রাণ বাংলার মানুষের জীবনকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছে। স্নিগ্ধ, মায়াময় প্রকৃতির মধ্যে মানুষের জীবনকে এই প্রকৃতির মাঝেই খুঁজে এবং খুঁজে পায়। এই ঋতুতে মানুষের আসে প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, অভিলাষ এবং মানুষের মনের মধ্যে জাগিয়ে তুলে ভাব, প্রকৃতিপ্রেম, বাঙালিয়ানা আর সৃজনশীল চিন্তাভাবনা। এ ঋতু বাংলার কৃষকদেরকে যেভাবে কর্মচাঞ্চল্য ফিরিয়ে দেয় তেমনি কবিদের মনে দেয় অফুরন্ত কল্পনা শক্তি। বাংলা কবিতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় হেমন্ত ঋতুর সাহিত্যে ধান কাটা, নবান্ন, শালিক, ঘুঘু, দ‚র্বা ঘাসে শিশিরবিন্দু প্রভৃতি চিত্র ওঠে এসেছে প্রকৃতির রূপ বৈচিত্র্যের ভেতর দিয়ে। সৃষ্টিশীল মানুষরাও নিভৃতে চর্চা করে শিল্পের চর্চা। নিঃশব্দে কবির মনের ভাবনা এবং কবিতা। গল্প, উপন্যাস, চিত্রকলা, চলচ্চিত্র, নাটক, যাত্রাপালা, পুতুলনাচ, জারি-সারি, বাউল গান, সবকিছুতেই হেমন্ত এনে দেয় নতুন মাত্রা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, জীবনানন্দ দাশসহ অনেক কবিই লিখেছেন এই হেমন্ত নিয়ে। একই সঙ্গে এই ঋতু মানবমনেও প্রভাব ফেলে। মানুষকে ভাবিয়ে তুলে শিল্পী ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশ চিরসবুজের দেশ। আদিগন্ত সবুজের হাতছানি এদেশে। মাঠ থেকে পাহাড় ক্ষেত থেকে প্রান্তর। বাড়ির ওঠান থেকে বাগান সর্বত্র সবুজের সমারোহ। অথচ এই সবুজের ভেতরই যেন হঠাৎ করেই হলুদবরণ এক ঋতু হেমন্ত এসে পড়েছে। এই হলুদ মানুষের জীবনে অনন্য প্রাপ্তি মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন সোনারঙ ধান।চিরসবুজের দেশে এই ঋতু সোনা আভা ছড়িয়ে দেয়। বদলে দেয় প্রকৃতির রূপ। হেমন্ত, প্রকৃতি আর আত্মমগ্ন একে অন্যের পরিপ‚রক হয়ে উঠে। যেন সোনার ধানের গন্ধ, সবুজ শস্য আর লাবণ্যময়ী ঋতু হেমন্ত। হেমন্ত শস্যের, তৃপ্তির, প্রকৃতির ঋতু। আর এই শস্যভরা ঋতুকে সবচেয়ে বেশি মহিমান্বিত করেছেন কবিতা ও বাংলাসাহিত্য। কবিতা ও বাংলাসাহিত্যে হেমন্তকে দেখেছেন প্রেমে, দেহে, সৃষ্টিতে, তৃপ্তিতে, বিরহে, মুগ্ধতায়। হেমন্ত রাতের নৈঃশব্দ্য স্পষ্ট করে ঘ্রাণ শক্তির সঙ্গে শ্রবণ শক্তির মেলবন্ধন ঘটিয়েছে।

হেমন্তের ছবির গুনকীর্তন করতে গিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম যেমন চাঁদকে উপজীব্য করেছেন, তেমনি জীবনানন্দও চাঁদের রূপের বর্ণনা দিয়েছেন মানুষের সৌন্দর্যবোধের সঙ্গে মিল রেখে। উপমা ও চিত্রকল্পে কাজী নজরুল ইসলাম জীবন্ত প্রাণচঞ্চল করে আর জীবনানন্দ হৃদয়ের, বাস্তব মাঠের চিত্র তুলে ধরেছেন বাংলা সাহিত্যে। আল মাহমুদের কবিতায় হেমন্ত এসেছে মানুষের প্রেমে ও প্রকৃতির সৌন্দর্যে। তাঁর কাছে হেমন্ত এক ধরনের পরিপ‚র্ণতার নাম। হেমন্তের এই কোমল হাওয়ায় কবি মনে এক ধরনের ভালোবাসার অনুভ‚তি সৃষ্টি হয়েছে। যে অনুভ‚তি আমাদেরকে নিয়ে যায় মাটির মানুষের দেহের ঘ্রাণের কাছে। আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় সৃষ্টি, ফসল ও তৃপ্তির সার্থকতার কথা। যেখানে ভালো মন্দের স্মৃতি হাত ধরাধরি করে চলে। মনে পড়ে কৈশোরের প্রেম, প্রাকৃতিক দৃশ্যরাজির আদিগন্ত শোভা।

প্রকৃতির সাথে মানুষের অস্তিত্বের সম্পর্ক নিবিড়ভাবে মিশে আছে। প্রকৃতি ছাড়া মানুষ কল্পনা করতে পারে না। প্রকৃতির ওপর এক বিশ্বস্ত অভিধানের গল্প যুগ যুগ ধরেই চলছে। কবিতার মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে এসব প্রকৃতির প্রেম, বিরহ, বিদ্রোহ ও চিত্রকল্প।

হেমন্তের মতো সৌন্দর্যর‚প এই ঋতু থাকায় বাংলা সাহিত্যও দিনদিন সমৃদ্ধি হয়েছে। কবিতা সেজে ওঠেছে নিজস্ব ঢঙে। কবিতার রূপ-রস-গন্ধ ছড়িয়েছে নবান্নে সৌরভের মতো। শিউলি, কামিনী, মল্লিকার সৌরভে সুরভিত হয়েছে চারদিক। অগ্রহায়ণে এই আমন ধানের শুভ্রতায় প্রাণ ফিরে পায় পুরোনো জীর্ণতা। কিষানীর উঠানের ধুলোর গন্ধ কবিতার শরীরের সাথে মিশে যায় নিপুণভাবে। ফসলি মাঠ আর শীতের হাওয়া দোল দেয় গ্রামের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে।

5

এই সময়ে নবান্ন উৎসব হয়, নতুন ধানের চিড়া তৈরী হয়, চাল আর খেজুরের রস মিশ্রিত আখের গুড়ের ক্ষির হয়। এমন রকমারী আয়োজনের সুগন্ধিতে আমোদ থাকে গ্রামের পর গ্রাম। অগ্রহায়ণ আমাদের বাঙালির জন্য ঐতিহ্য আর খুশির বার্তা বাহক। আবহমান বাংলার শাশ্বত অগ্রহায়ণকে ঘিরে কৃষক কৃষাণীদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ¡াস দেখা দেয়। শীত, শিশির আর সোনার ফসলের মৌ মৌ ঘ্রাণ হেমন্তের চারদিক মাতিয়ে তুলে। সন্ধ্যা হলেই হালকা শীতের আমেজ অনুভ‚ত হয়। রাতে ঝড়ে শিশির কণা। সকালে স‚র্যের আলোয় মুক্তার মত ঝলমল করে দ‚র্বা ঘাস, মৃদু বাতাসে দুলে মাঠে নুয়ে পড়া ধানের শীষ। প্রতিটি গৃহস্থ ঘরে চলে অগ্রহায়ণের ধান কাটার উৎসব। যেন শাশ্বত বাঙালির চেনা রুপ।

হেমন্ত এক অপরূপা সুন্দরী। ঋতুকন্যা হৈমন্তীর প্রেমে হাবুডুবু খায় পুরো প্রকৃতি। শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে আমাদের মাঝে আসে হেমন্ত । এসময় প্রকৃতি ভিন্ন রূপে সেজে সবাইকে মুগ্ধ করে নবান্নের উৎসবে। শিশির ভিজা শিউলি ফুল, কৃষকের নতুন ধান কাটার ব্যস্ততা, নতুন ফসল ঘরে তুলার আনন্দে কৃষানীর হাসিমুখ। ঘরে ঘরে পিঠা বানানোর উৎসব, মিষ্টি হিমেল হাওয়া এ যেন প্রকৃতির অপার মহিমা। শরতের সাদা মেঘের ভেলা উড়িয়ে হিম মৃদু কুয়াশার স্তর ও নতুন ধানের মিষ্টি গন্ধ হেমন্তের আগমন জানান দেয় প্রকৃতিতে।

ষড়ঋতুর মধ্যে হেমন্ত একটি সৌন্দর্যর‚পের ঋতু। শান্ত, স্নিগ্ধ, মধুর হিমেল ভরপ‚র্ণ ঋতু এই হেমন্ত। এই ঋতুর যেন সৌন্দর্যর‚পের তুলনা হয় না। প্রতি বছর ঋতুর পালাবদলে সোনালি রঙের সৌন্দর্য্য নিয়ে হেমন্ত আমাদের মাঝে আসে। হেমন্তের এই সময়ে মাঠে ওঠানে থাকে সোনালি ধান। হেমন্তের হিম শীতল হাওয়ায় হাওরের সোনালি ধানের শিষে ঢেউ খেলে যায়। কিচিরমিচির পাখির ডাক, শিশিরে ভেজানো দ‚র্বাঘাস, শুকিয়ে যাওয়া পথঘাট, ফুল সুরভি ঢেলে, পাকা ধানের মৌ মৌ ঘ্রাণের সাথে মিষ্টি স‚র্যের হাসি ছড়িয়ে, নবান্নের আমন্ত্রণে হেমন্ত হয় শিল্পীর ছবি আঁকার মতো বাংলাদেশ। এসময়ে কৃষক-কৃষাণীর মুখে হাসি থাকে নতুন ফসল ঘরে তুলার আনন্দে, গাছের ছায়ায় রাখাল বালকের মধুর বাঁশির সুরে প্রকৃতি মিশে যায় হেমন্তের ভালোবাসায়।

এ ঋতুকে নিয়ে কবি লিখেন কবিতা, ছড়াকার লিখেন ছড়া। বাউলদের মনে জাগে ভাব আর ছন্দ। বাউলরা একতারা বাজিয়ে মেঠোপথ দিয়ে দ‚র সীমানায় মিশে যান বাউল গানের আসরে। এসময় কিছুটা কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে নদ-নদী আর সবুজ গ্রাম।

হেমন্ত উৎসব আনন্দের প্রধান মৌসুম। ঘরে ঘরে ফসল তোলার আনন্দ আর ধান ভানার গান ভেসে আসে বাতাসে। এখনো গ্রামের কিছু বাড়িতে ঢেঁকির তালে মুখর বাড়ির আঙিনা। নবান্ন আর পিঠেপুলির আনন্দে মাতোয়ারা হয় সবাই। এই হেমন্ত ঋতুতেই অগ্রহায়ণের ধান কাটা, মাড়াই এবং কৃষকের গোলায় তোলা উপলক্ষে গ্রামের ঘরে ঘরে উৎসব হয়।

গ্রামে এখনো ফসল তোলার সময় নতুন ধানের চালের ফিরনি-পায়েস অথবা ক্ষীর তৈরি করে আত্মীয়-স্বজন ও পাড়ার প্রতিবেশীর ঘরে ঘরে বিতরণ করেন। মেয়ের জামাইকে নিমন্ত্রণ করে অগ্রহায়ণকে উপলক্ষ করে, মেয়েরাও মেহমান হয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন।

1

হেমন্তের এই সময়ে বিভিন্ন ধরনের দেশীয় নৃত্য, গান, পুঁথিপাঠসহ আবহমান বাংলার সাংস্কৃতিক আনন্দ উদযাপন করেন। এ ঋতুতে ফুটে গন্ধরাজ, মল্লিকা, শিউলি, কামিনী, হিমঝুরি, দেবকাঞ্চন ও রাজ অশোক প্রভৃতি। হেমন্তকালে বৃক্ষরাজি থাকে সবুজে ভরা। খাল-বিল, নদী আর বিলজুড়ে দেখা যায় সাদা-লাল শাপলা আর পদ্মফুলের মেলা। এসময়ে কাঁঠালিচাঁপার গন্ধে ভরে যায় মিষ্টি দুপুর।

হেমন্তের রাতের আকাশে দেখা যায় অসংখ্য তারার মেলা। এই সময়ে আকাশে জমাটবাঁধা মেঘেরও দেখা মেলে না। মিটিমিটি তারা জ্বলে সারারাত ভর। সেই সাথে চাঁদের শরীর থেকেও জোছনা ঝরে পড়ে পৃথিবীজুড়ে। ঝিরিঝিরি বাতাস আর মৃদু আলোর ঝলকানিতে তৈরি হয় মায়াময় এক রাত। অন্যদিকে, খুব ভোরে একটু শীতল বাতাস, সেই সাথে ঘাসের ও ধানগাছের ডগায় জমতে শুরু করা শিশিরের বিন্দু বিন্দু কণা জানিয়ে দেয় হেমন্তের তাৎপর্য । নদী ও হাওর বিলে পানি বেশ নেমে যায়। তখন জেলেরা একটি ভিন্ন আনন্দের অনুভ‚তি নিয়ে মাছ ধরা শুরু করেন। শান্ত নদীতে ভেসে চলে একাধিক নৌকা। হেমন্তের শেষ দিকে দ‚র দেশ থেকে দল বেঁধে আসে অতিথি পাখি। শীত বা তুষারপ্রবণ অঞ্চল থেকে এসব পাখি ছুটে আসে কিছুটা উষ্ণতার আশায় আমাদের দেশে । তাই হেমন্তকে বলা হয় শীতের প‚র্বাভাস। এ সময় কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে নদ-নদী, গোটা গ্রাম। এ সময় গ্রামে গ্রামে ধুম পড়ে যায় খেঁজুর রসের পিঠা আর নতুন চালের শিরনি তৈরীর প্রতিযোগিতা। কৃষকের গরু মহিষও চড়ে মাঠে হাওরে। হারিয়ে যায় এ গ্রাম থেকে ভিনগাঁয়ে অথবা অন্যপথে।

এসময় শহরে থাকা তরুণ ছেলেটিও গ্রামে যায় হেমন্তকে কাছ থেকে উপভোগ করার। তার দু’চোখে ভাসে ফেলে আসা দিনগুলোর দুরন্ত শৈশব, কৈশোর, আর আগামীর স্বপ্ন। হেমন্তের এই দিনে কৃষকের কন্ঠে শুনা যায় ভাটিয়ালি, ভান্ডারি আর মুরশিদি গানের সুর। সব মিলে আমাদের মনে অন্যরকম একটি ভালোলাগা দোল দিয়ে যায় হেমন্ত ঋতু।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।

Sharing is caring!


আর্কাইভ

May 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031

সর্বশেষ সংবাদ

ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মনোনীত হলেন ইবনে জাহান তানভীর

ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মনোনীত হলেন ইবনে জাহান তানভীর

5 ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া সংগঠন ‘ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব’-এর কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে মনোনীত হয়েছেন সিলেট মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দল আহ্বায়ক কমিটির

হবিগঞ্জে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে সং ঘ ব দ্ধ ধ র্ষ ণ

হবিগঞ্জে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে সং ঘ ব দ্ধ ধ র্ষ ণ

3 হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ৯ বছরের এক শিশুকে মুখে গামছা বেঁধে বাঁশঝাড়ে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। রোববার

দেশে নারী-শিশু নির্যাতন বৃদ্ধি ও সিলেটে র‌্যাব সদস্য খুনের প্রতিবাদে ‘সিলেট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’-এর মানববন্ধন

দেশে নারী-শিশু নির্যাতন বৃদ্ধি ও সিলেটে র‌্যাব সদস্য খুনের প্রতিবাদে ‘সিলেট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’-এর মানববন্ধন

3 সারাদেশে রামিসা, ফাহিমা সহ ক্রমাগত নারী ও শিশু ধর্ষণ, নৃশংস হত্যা, সিলেটে কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় র‌্যাব সদস্য ইমন আচার্য

বরমচালের বড়ছড়া নদীর বালুমহাল ইজারা বাতিলের দাবিতে ইউএনও’কে স্মারকলিপি

বরমচালের বড়ছড়া নদীর বালুমহাল ইজারা বাতিলের দাবিতে ইউএনও’কে স্মারকলিপি

8 মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী বড়ছড়া নদীর বালুমহালের ইজারা স্থায়ীভাবে বাতিলের দাবিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর স্মারকলিপি

বিশ্ব থাইরয়েড দিবস উপলক্ষে এনজেএল ইএনটি সেন্টারের স্বাস্থ্যসেবা ও আলোচনা সভা

বিশ্ব থাইরয়েড দিবস উপলক্ষে এনজেএল ইএনটি সেন্টারের স্বাস্থ্যসেবা ও আলোচনা সভা

5 ‘জানুন, পরীক্ষা করুন, জয় করুন, আপনার থাইরয়েড, আপনার রক্ষক’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বিশ্ব থাইরয়েড দিবস উপলক্ষে সচেতনতামূলক আলোচনা

পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে সিলেটবাসীসহ দেশবাসীকে খন্দকার মুক্তাদিরের শুভেচ্ছা

পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে সিলেটবাসীসহ দেশবাসীকে খন্দকার মুক্তাদিরের শুভেচ্ছা

5 পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে সিলেটবাসীসহ দেশ ও বিদেশের সকল মুসলমানকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানিয়েছেন সরকারের বাণিজ্য, শিল্প, পাট

ঈদুল আজহা উপলক্ষে সিলেট নগরবাসীকে কয়েস লোদীর শুভেচ্ছা

ঈদুল আজহা উপলক্ষে সিলেট নগরবাসীকে কয়েস লোদীর শুভেচ্ছা

3 পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে সিলেট মহানগরবাসীসহ দেশ-বিদেশে অবস্থানরত সকল মুসলিম ভাই-বোনদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন সিলেট মহানগর বিএনপির

দক্ষিণ সুরমা প্রেসক্লাবের কার্যনির্বাহী কমিটির প্রথম সভা

দক্ষিণ সুরমা প্রেসক্লাবের কার্যনির্বাহী কমিটির প্রথম সভা

3 দক্ষিণ সুরমা প্রেসক্লাবের নবগঠিত কার্যনির্বাহী কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (২৫ মে) ক্লাব কার্যালয়ে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।

1
7