কবিগুরুর সকল স্মৃতিস্থান সংরক্ষণ করা হবে: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী
কবিগুরুর বাঙালির সাধনা’ ও মহৎ আকাঙ্খায় বাঙালির নেতৃত্বে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার কথা ব্যক্ত হয়েছে— কামরুল ইসলাম
বঙ্গীয় সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সহযোগিতায় কবিগুরুর সিলেট পরিভ্রমণের ১০৪তম বর্ষ উদযাপনের রবীন্দ্র স্মরণ অনুষ্ঠান ০৪ নভেম্বর বিকাল ৪টায় নগরীর পূর্ব শাহী ঈদগাহস্থ জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে সম্পন্ন হয়। কবিগুরুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন, বিশ্বপ্রদীপ প্রজ্জ্বলন, শান্তি প্রার্থনা পাঠ, ‘রবীন্দ্র ভাবনায় বাঙালির সাধনা’ শীর্ষক আলোচনা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মাধ্যমে অতিথি ও শিল্পীগণ রবীন্দ্র স্মরণ অনুষ্ঠান অনন্য মর্যাদায় নিবেদন করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি সিলেট সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি স্থান সংরক্ষণ, স্মার্ট সিলেট নগর গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি আরও বলেন, এই অধ্যাত্ম শহরে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় কবি সহ প্রখ্যাত ব্যক্তির আগমন ঘটেছে। আমরা তাঁদেরকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। সিলেটের সকল মানুষ শান্তিতে বসবাস করবেন। কারো উপর কেউ অন্যায় করা থেকে বিরত থাকবেন । জাতির পিতার কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন সিলেট নগরকে পরিবেশ বান্ধব আধুনিক নগর সৃষ্টি করার। সিলেট সিটির জনগণ আমার উপর আস্থা রেখে নির্বাচিত করেছেন। আমি নগর পিতা হিসেবে নয়, একজন সেবক হিসেবে আপনাদের পাশে থাকব। স্মার্ট সিলেট’ হিসেবে গড়ে তুলব।
তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদের কার্যক্রমে ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে সকল প্রকার সহযোগিতার আশ্বাস দেন ।
রবীন্দ্র স্মরণ অনুষ্ঠান বাস্তবায়ন পর্ষদের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা ভবতোষ রায় বর্মণের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য রাখেন বিশেষ অতিথি রবীন্দ্র অনুরাগী জ্যোতির্ময় সিংহ মজুমদার চন্দন ও বিশিষ্ট রবীন্দ্র গবেষক মিহিরকান্তি চৌধুরী, মুখ্য আলোচক বঙ্গীয়’র কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কবি প্রাবন্ধিক কামরুল ইসলাম, সম্মিলিত নাট্য পরিষদ সিলেটের সভাপতি রজত কান্তি গুপ্ত, বঙ্গীয়’র শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য, রবীন্দ্র স্মরণ অনুষ্ঠান বাস্তবায়ন পর্ষদের সদস্য সচিব অসিত বরণ দাশ গুপ্ত।
মুখ্য আলোচক কামরুল ইসলাম সমকালে রবীন্দ্র ভাবনায় বাঙালির সাধনা’ শীর্ষক আলোচনায় বলেন, কার্তিকের নম্রমধুর প্রকৃতির ‘সুন্দরী শ্রীভূমি’তে রবীন্দ্রনাথ ১০৩বছর পূর্বে এসে বাঙালির সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ উত্তর বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভৌগোলিক কাঠামোর পরিবর্তন হচ্ছে, সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশ ব্যবস্থা ভেঙে যাচ্ছে, নতুন নতুন রাষ্ট্রের আর্বিভাব, যুদ্ধে বিধ্বস্ত বিশ্বের নানান দেশ। জালিয়ান ওয়ালা বাগে নির্মম হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে কবিগুরু ১৯১৯ সালের জুনে ব্রিটিশ উপাধি ‘স্যার’ ত্যাগ করেন। এরকম একটা সময় কবিগুরু সিলেটে এসেছিলেন সিলেট ব্রাহ্ম সমাজ, আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম, শ্রীহট্ট মহিলা সমিতির আমন্ত্রণে। শিলং থেকে চেরাপুঞ্জ পথ পরিহার করে আসাম বেঙ্গল রেলে শ্রীহট্টে আসেন। কবিগুরু সুরমা নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত শহরে নৌকায় তীরে পৌঁছালে হাজার হাজার জনতা ‘ রবীন্দ্রনাথ কি জয়, বন্দে মাতরম, আল্লাহ আকবর’ ইত্যাদি শ্লোগান, হর্ষধ্বনিতে জয়ধ্বনি দিতে থাকে। চাঁদনী ঘাট থেকে ফিটন গাড়িতে কবিগুরুর পাশে ছিলেন শিক্ষাবিদ মৌলভী আব্দুল করিম ।
কবিগুরুর তিন দিন অবস্থানের সময় ১৯১৯ সালের ০৬ নভেম্বর নাগরিক সংবর্ধনায় টাউন হলে দেড় ঘন্টা ‘বাঙালীর সাধনা’ শীর্ষক বক্তব্য দেন। পরের দিন ‘আকাঙ্খা’ শীর্ষক ১ঘন্টাব্যাপী বক্তব্য দেন কলেজ হোস্টেলে । এছাড়াও তিনি ব্রহ্ম মন্দিরের প্রার্থনা সভা, মাছিমপুর মণিপুরী, সিংহ বাড়ির নব নির্মিত গৃহে নামকরণের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন । টমাস সাহেবের বাংলোয় অবস্থানের সময় রাতে মণিপুরী নৃত্য উপভোগ করেন।
কবির তিনদিন পরিভ্রমণের সময় উৎসব আনন্দে পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান ছিল।
কবিগুরু বাঙালির সাধনায় বাঙালির জাগরণ এবং আকাঙ্খায় নতুন প্রজন্মকে জেগে ওঠার কথা বলেন।
” একদিন পৃথিবীর এক ধর্ম হবে। বাংলা দেশ ভারতের পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত। সমগ্র ভারতবর্ষ তাই আজ বাংলার দিকে আশা করে আছে। বাঙালীকেই আজ ভারতের জনজাগরণযজ্ঞে পৌরহিত্য করতে হবে।’
কবিগুরুর বাঙালির জাগরণে আরো বলেন, সেই শক্তি শ্রেষ্ঠ শক্তি যে শক্তি থেকে সৃষ্টি হয়।’
বাঙালির সাধনাকে বাস্তবায়ন করার জন্য মহৎ আকাঙ্খায় নতুন প্রজন্মকে বিশ্ব জাগরণে গড়ে ওঠার আহবান জানান।
” বৃদ্ধের সতর্ক বিজ্ঞতা বড় সত্য নয়, নবীনের দুঃসাহসিক অনভিজ্ঞতা তার চেয়ে বড় সত্য।…. তোমরা নবীন। তোমরা যে বার্ত্তা বহন করে এনেছ সেই বার্ত্তা তোমরা ভুলবে না। এই পৃথিবীর সকল প্রকার জার্ণতাকে তোমরা সরিয়ে দিতে এসেছ; কেননা জীর্ণতাই আবর্জনা, জীর্ণতা যাত্রাপথের বাধা।… তোমরা নবীন, তোমাদের হাতে পৃথিবীর ভার নূতন করে পড়েচে, তোমাদের ভবিষ্যতকে আচ্ছন্ন হতে দিয়ো না, পথ পরিষ্কার কর।’
কবির ভাবনার প্রতিফলন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে, বাংলার সকল ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনে দেখতে পাই । জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির সাধনায় বাংলার মানুষের জন্য স্বাধীন দেশ সৃষ্টি করেছেন। জাতির পিতাই কবিগুরুকে সত্যিকার উপলব্ধি করেছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত কবিগুরুর । জাতির পিতা বিশ্বশান্তির জন্য জাতিসংঘে দেয়া বক্তব্য প্রাসঙ্গিক এবং জুলিও কুরী শান্তি পদক প্রাপ্তির মাধ্যমে বাঙালির বিশ্ব মর্যাদা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে ।
জাতির পিতার কন্যা বঙ্গোত্তম শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শান্তি সংস্কৃতির প্রস্তাব ২০২৩ সালে ১০০টি দেশের সমর্থন জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গৃহিত হয়েছে । বাংলার পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা, দূর্গা পূজা , জামদানি, শীতলপাটি — এসব ইউনেস্কোর হেরিটেজে স্বীকৃতি লাভ করেছে। বাংলা ভাষার আন্দোলনের কারণে জাতিসংঘে গৃহিত “আন্তর্জাতিক মার্তৃভাষা দিবস বিশ্বে পালিত হচ্ছে ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাঙালির সাধনার’ উত্তরাধিকার হিসেবে সাংস্কৃতিক জাগরণে কবি লেখক শিল্পী গবেষক দের যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে হবে। সাম্প্রদায়িক, জঙ্গি, ধর্মান্ধদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে। এইক্ষেত্রে নিরপেক্ষ বলে কিছু নেই।
তিনি আরো বলেন, সিলেটে বঙ্গীয় সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদ প্রতি বছর আপনাদের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতায় রবীন্দ্র স্মরণ অনুষ্ঠান পালন করবে। সাংস্কৃতিক জাগরণের মাধ্যমে দেশকে জাগ্রত করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি সংস্কৃতির মাধ্যমে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাঙালিদের অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।
কবিগুরুর বাঙালির সাধনায় হিন্দু, মুসলিম, খৃস্টান—বাঙ্গালি, মাড়োয়ার, ইংরাজ, নৃগোষ্ঠীসহ সকলের সম্প্রীতি চেয়েছেন ।
অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্বে দলীয় নৃত্য পরিবেশন করেন করেন জেলা শিল্পকলা একাডেমি ও মণিপুরী কালচারাল একাডেমি, মাছিমপুর। আবৃত্তি করেন জ্যোতি ভট্টাচার্য। সংগীত পরিবেশন করেন, রাণা কুমার সিনহা, প্রতীক এন্দ, সুমনা আজিজ, অনিমেষবিজয় চৌধুরী, নমিতা পাল চৌধুরী মুক্তা ও মুন্না দত্ত।
সমবেত জাতীয় সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্র স্মরণ অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।
কবি, লেখক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী ও রবীন্দ্র অনুরাগী দর্শকের সমারোহ, মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা ও ঋদ্ধ আলোচনায় প্রাণবন্ত ছিলো পুরো আয়োজন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন রবীন্দ্র স্মরণ অনুষ্ঠান বাস্তবায়ন পর্ষদের যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাক আহমেদ ও রীমা দাস।
কবিগুরুর স্মৃতি স্থাপনা সংরক্ষণ, কবিগুরুর ভাস্কর্য স্থাপনসহ রবীন্দ্র মুক্তমঞ্চ, মাছিমপুরে রবীন্দ্র ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উপর বক্তাগণ অভিমত ব্যক্ত করেন ।
Sharing is caring!